তরফরত্ন খ্যাত শিকড় সন্ধানী গবেষক, ইতিহাসবিদ ও আধুনিক বাংলা ইসলামি সাহিত্যের অন্যতম বাকনির্মাতা সৈয়দ আব্দুল্লাহর ৭৯তম জন্মদিন আজ। ১৯৪৭ সালের ৩ নভেম্বর হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার উত্তরসুর গ্রামের ঐতিহ্যবাহী সৈয়দ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বাংলা সাহিত্য ও ইতিহাস গবেষণায় অসামান্য অবদান রাখা এই মনীষী নিজ কর্মগুণে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি অর্জন করেন।
সাহিত্য, ইতিহাস ও গবেষণায় নিবেদিতপ্রাণ সৈয়দ আব্দুল্লাহ ছিলেন বহুগ্রন্থপ্রণেতা, বিদগ্ধ পণ্ডিত ও সাহিত্য সংগঠক। জীবনের দীর্ঘ সময় তিনি নিজ গ্রাম উত্তরসুরে কাটিয়েছেন। সাহিত্যের প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকে সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর প্রাপ্ত পেনশনের অর্থ ব্যয় করে নিজের অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপিগুলো গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেন। সাহিত্যের প্রতি এমন আত্মনিবেদনের দৃষ্টান্ত সত্যিই বিরল।
আধুনিক বাংলা ইসলামি সাহিত্যের বিকাশ ও সমৃদ্ধিতে তাঁর অবদান স্মরণীয়। প্রায় পাঁচ দশক আগে বাংলা সাহিত্যে ইসলাম, মুসলিম ইতিহাস ও ঐতিহ্যভিত্তিক গবেষণার যে শূন্যতা ছিল, তা পূরণে যেসব মনীষী অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন, সৈয়দ আব্দুল্লাহ তাঁদের অন্যতম। সত্তরের দশকের জনপ্রিয় কলাম লেখক হিসেবে তিনি পরিচিতি লাভ করেন। মাসিক মদীনার সূচনালগ্ন থেকেই তিনি এর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। পাশাপাশি দেশের শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিকগুলোতেও তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়েছে। একসময় দৈনিক ইনকিলাবেও তিনি বিভিন্ন প্রবন্ধ লিখেছেন।
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে মুসলমানদের অবদান, মুসলিম কবি-সাহিত্যিক এবং আরাকান রাজসভার সাহিত্যচর্চা নিয়ে তাঁর গবেষণা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতি লাভ করে। তাঁর উল্লেখযোগ্য গবেষণাগ্রন্থ ‘রক্তস্নাত পলাশী’ উভয় বাংলায় পাঠকসমাজে ব্যাপক সমাদৃত। এ ছাড়া মহাকবি সৈয়দ সুলতান, সিলেটের নাগরী লিপি, হজরত শাহজালাল (রহ.) ও সিরাতবিষয়ক গবেষণায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
গবেষণাকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি লাভ করেন দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সম্মাননা ও পুরস্কার। এশিয়া প্রেস ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে এশিয়ার সেরা একশ পণ্ডিত-মনীষীর স্বীকৃতি এবং বিএনএসআই ইংল্যান্ড আন্তর্জাতিক স্বর্ণপদক অর্জন করেন। বিশ্বকোষ ও ওয়ার্ল্ড পিডিয়াতেও তাঁর জীবনী স্থান পেয়েছে। তিনি একসময় বাংলা একাডেমির ফেলো ছিলেন। বিশ্বকোষ ও এশিয়াটিক সোসাইটির বাংলাপিডিয়াসহ বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি সংগঠক হিসেবেও তাঁর অবদান অনন্য। ঐতিহ্যবাহী তরফ সাহিত্য পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন তিনি। গ্রামীণ জনপদে পাঠাগার প্রতিষ্ঠা ও জ্ঞানচর্চার প্রসারে রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তাঁর উদ্যোগ ও প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের মধ্যে রয়েছে জামেয়া মাহমুদীয়া হামিদনগর, জামেয়া মোবারকীয়া উত্তরসুর, বাহুবল পাবলিক লাইব্রেরি, বাহুবল প্রেসক্লাব ও বাহুবল একুশে বইমেলা।
তিনি আওলাদে রাসুল আমিরুল হিন্দ ফেদায়ে মিল্লাত মাওলানা সাইয়্যেদ আসআদ আল মাদানী (রহ.)-এর একনিষ্ঠ শিষ্য ছিলেন। ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখার পাশাপাশি মহান মুক্তিযুদ্ধেও সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৮ সালে বৃহত্তর সিলেট বিভাগের ২৫টি সাহিত্য, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে গ্রামীণফোনের সহযোগিতায় বাহুবল একুশে বইমেলায় বর্ণাঢ্য গণসংবর্ধনার মাধ্যমে তাঁকে ‘তরফরত্ন’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। পরবর্তী সময়ে ২০১৮ সালে বাহুবল উপজেলাবাসীর উদ্যোগে ৫৩টি তোরণ নির্মাণ করে তাঁকে নাগরিক সংবর্ধনা দেওয়া হয়। তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও সাহিত্য সাময়িকী বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে।
২০২২ সালের ২ এপ্রিল ঢাকার ধানমন্ডির বাসায় ইন্তেকাল করেন এই বরেণ্য গবেষক ও সাহিত্যিক। তাঁর একমাত্র ছেলে লেখক ও গবেষক সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ সম্প্রতি বাবার জীবন, কর্ম ও স্মৃতিচারণ নিয়ে ‘আমার আব্বা’ নামে ৬০০ পৃষ্ঠার একটি বৃহৎ গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন।
এদিকে, বরেণ্য এই মনীষীর ৭৯তম জন্মদিন উপলক্ষে তরফরত্ন ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ঢাকা ও বাহুবলে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। সাহিত্য ও ইতিহাস গবেষণায় তাঁর অবদান স্মরণ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর কর্ম ও চিন্তাধারা তুলে ধরাই এসব আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য।
বাংলা সাহিত্য, ইতিহাস গবেষণা ও ইসলামী জ্ঞানচর্চায় সৈয়দ আব্দুল্লাহর অবদান তাঁকে স্মরণীয় করে রাখবে। তাঁর সৃষ্টিকর্ম ও গবেষণা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য হয়ে থাকবে মূল্যবান সম্পদ।