হবিগঞ্জের মাধবপুর, চুনারুঘাট ও বাহুবল উপজেলায় সিলিকা বালুমহালকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। অভিযোগ রয়েছে, খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় প্রশাসনের একটি অংশ এবং প্রভাবশালী বালু ব্যবসায়ীদের যোগসাজশে কৌশলে ইজারা প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রাখা হয়েছে। ফলে বৈধতা ছাড়াই দিন-রাত অবাধে কোটি কোটি টাকার সিলিকা বালু উত্তোলন ও পাচার চলছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, হবিগঞ্জ জেলায় মোট ২৩টি সিলিকা বালুমহাল থাকলেও ১৪৩১-১৪৩২ বাংলা সনে এসব মহাল ইজারা দেওয়া হয়নি। অথচ প্রশাসনের নজরদারির ঘাটতির সুযোগে চুনারুঘাটের সুতাং নদী, দেউন্দি এলাকা এবং বৃন্দাবন চা-বাগানসহ বিভিন্ন সংরক্ষিত এলাকা থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চলছে। এতে একদিকে সরকার বিপুল অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবেশ পড়ছে মারাত্মক হুমকির মুখে।
স্থানীয় সাংবাদিক নেতা ওলীদ মিয়া বলেন, “এখানে একটি সংঘবদ্ধ দুষ্টচক্র সক্রিয় রয়েছে। তারা পরিকল্পিতভাবে নিলাম প্রক্রিয়া বন্ধ রেখে অবৈধ উত্তোলনের সুযোগ সৃষ্টি করছে। ২০২৩ সালে সোনাই নদীতে প্রায় ৬ কোটি টাকায় ইজারা হয়েছিল। বর্তমানে ইজারা না থাকায় সরকার বছরে প্রায় ৪০ থেকে ৬০ কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে।” তিনি এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
এদিকে অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে হাইকোর্ট কঠোর অবস্থান নিয়েছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)-এর দায়ের করা এক রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে আদালত অবৈধ উত্তোলনে জড়িতদের তালিকা প্রণয়ন, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে তিন মাসের মধ্যে অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নিষিদ্ধ ড্রেজার ব্যবহার করে পাহাড়ি টিলা ও নদী থেকে বালু উত্তোলনের ফলে ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ছে। এতে জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পরিবেশ কর্মী বিশ্বজিৎ পাল বলেন, “দ্রুত কঠোর পদক্ষেপ না নিলে আমরা বৃহত্তর আন্দোলনে যেতে বাধ্য হব। বছরে অর্ধশত কোটি টাকার রাজস্ব হারানোর পাশাপাশি পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সব বিভাগের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।”
এ বিষয়ে হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক জিএম সরফরাজ বলেন, “বালুমহাল ইজারা দেওয়ার বিষয়ে আমরা কাজ করছি। বৈধ উত্তোলনকারীদের তালিকা প্রস্তুত করে প্রেরণ করা হয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে পরিস্থিতির উন্নয়নে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।”
সচেতন মহলের মতে, দীর্ঘদিন ধরে চলমান এই অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে একদিকে রাষ্ট্র বিপুল রাজস্ব হারাবে, অন্যদিকে পরিবেশের ওপর পড়বে ভয়াবহ প্রভাব। তাই সিন্ডিকেট ভেঙে স্বচ্ছ ও আইনসম্মত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।