
ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক কারণে পুরো হবিগঞ্জ জেলা জুড়ে আমাদের প্রিয় বাহুবল উপজেলার একটি স্বতন্ত্র এবং গৌরবময় সুনাম রয়েছে। যুগ যুগ ধরে এই জনপদে মুসলিম, হিন্দুসহ সকল ধর্মের মানুষ যেভাবে পারস্পরিক সৌহার্দ্য, গভীর মেলবন্ধন এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনা বুকে ধারণ করে বসবাস করে আসছেন, তা এক অনন্য দৃষ্টান্ত। আমাদের এই সামাজিক ঐক্য ও সুন্দর মিলেমিশে থাকার বন্ধন কেবল একটি উপজেলাকে নয়, বরং পুরো জেলাকে এক সুদৃঢ় শান্তির বার্তা দিয়ে এসেছে। এই ঐতিহ্য আমাদের পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া এক অমূল্য সম্পদ, যা আমাদের অহংকার ও আত্মপরিচয়ের অংশ।
কিন্তু অত্যন্ত গভীর উদ্বেগ এবং বেদনার সাথে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের এই শান্ত ও সুশৃঙ্খল সমাজে এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক অস্থিরতা এবং সহনশীলতার অভাব দেখা দিচ্ছে। অতি তুচ্ছ, সাধারণ এবং ক্ষণস্থায়ী কিছু বিষয়কে কেন্দ্র করে আমাদের এলাকায় প্রায়শই বড় ধরণের মারামারি, ঝগড়াঝাঁটি, এবং বিবাদ-ফাসাদের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছে। এই ক্ষণিকের উত্তেজনা ও জিদ রূপ নিচ্ছে দীর্ঘমেয়াদী শত্রুতায়।
এরই ধারাবাহিকতায় বহু মানুষ গুরুতর আহত হচ্ছেন, এবং সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো—অকালে ঝরে যাচ্ছে মূল্যবান কিছু প্রাণ। গতকাল একটি সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে আমাদেরই এক ভাই সায়েদ নামে একজন নিহত হয়েছেন।
একটি অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু বা হত্যাকাণ্ড কেবল একটি জীবনের অবসান ঘটায় না; বরং একটি পুরো পরিবারকে চিরতরে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। যে সন্তান তার বাবাকে হারালো, যে মা তার সন্তানকে হারালো, তাদের এই শূন্যতা কোনোদিন পূরণ হবার নয়। অন্যদিকে, এই তুচ্ছ সংঘর্ষের জেরে যখন মামলা-হামলা শুরু হয়, তখন শত শত মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে ফেরারি হয়ে বেড়ায়। এলাকার অর্থনৈতিক উন্নয়ন থমকে দাঁড়ায়, শিক্ষা জীবন ব্যাহত হয় তরুণদের, এবং সামাজিকভাবে আমরা এক চরম নিরাপত্তাহীনতার দিকে ধাবিত হই।
আমাদের বিবেক ও মানবতার কাছে আজ একটাই প্রশ্ন—আর কত? আর কতকাল আমরা এভাবে তুচ্ছ কারণে নিজেরা নিজেদের ভাইয়ের রক্ত ঝরাব? আর কতদিন আমরা অশান্তির এই আগুনে আমাদের সুন্দর সমাজকে পুড়িয়ে ছারখার করব?
একটি প্রগতিশীল, নিরাপদ ও শান্তিময় সমাজ বিনির্মাণ করা কেবল কোনো একক ব্যক্তি বা প্রশাসনের দায়িত্ব নয়। এটি আমাদের সকলের যৌথ সামাজিক দায়বদ্ধতা। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের এখনই সম্মিলিতভাবে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে:
রাগ বা উত্তেজনার মুহূর্তে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন করতে হবে। যেকোনো উস্কানিকে শুরুতেই কঠোরভাবে অবদমন করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।
যেকোনো ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বিরোধ তৈরি হলে আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, মুরুব্বি এবং সমাজসেবকদের উপস্থিতিতে আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধান করতে হবে।
আমাদের তরুণ ও যুব সমাজকে ধ্বংসাত্মক পথ পরিহার করে সৃজনশীল ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজে সম্পৃক্ত হতে হবে। এলাকার শান্তি রক্ষায় তরুণদেরই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।
সমাজে অপরাধী যেই হোক না কেন, তাকে আইনের হাতে সোপর্দ করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই দলবদ্ধ হয়ে প্রতিশোধ নেওয়ার সংস্কৃতিকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না।
সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসবগুলোতে পারস্পরিক অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে, যেন আমাদের মধ্যকার মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব দূর হয় এবং ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আরও সুদৃঢ় হয়।
আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য, নিরাপদ ও অহিংস সমাজ রেখে যাওয়া আমাদের নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব। আমরা যদি আজ সচেতন না হই, তবে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।
আসুন আমরা অঙ্গীকার করি, সকল প্রকার হিংসা-বিদ্বেষ, অহংকার ও সংকীর্ণতা পরিহার করে আমরা একে অপরের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলি। পারস্পরিক ভালোবাসার মাধ্যমে সুন্দর সমাজ গঠন করি এবং আমাদের প্রিয় বাহুবলকে একটি আদর্শ ও শান্তিময় উপজেলা হিসেবে পুনর্প্রতিষ্ঠা করি।
ধন্যবাদান্তে
শান্তি, সম্প্রীতি ও প্রগতির প্রত্যাশায়
মুফতী নিজাম উদ্দিন আল আদনান
চেয়ারম্যান, বাহুবল নবীগঞ্জ উন্নয়ন ফাউন্ডেশন
মুফতী নিজাম উদ্দিন আল আদনান 








