Dhaka ০৭:০৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনামঃ
ঐতিহ্যবাহী বাহুবলের গৌরব রক্ষা ও সামাজিক সম্প্রীতি বিনির্মাণে আমাদের যৌথ দায়বদ্ধতা বাহুবলে অবৈধ বালু উত্তোলন ও পরিবহন, ২ লাখ টাকা জরিমানা মাদ্রাসায় শিশু শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন কার্যকর জবাবদিহি বাহুবলে আদর্শ মিষ্টি ঘরে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে মিষ্টি তৈরি, জরিমানা ১ লাখ টাকা শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডে মিরপুর কলেজের শিক্ষার্থী পিয়াল সাময়িক বহিষ্কার, ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি বাহুবলে শিক্ষার্থীদের আর্থিক সচেতনতা বাড়াতে ‘স্টুডেন্ট ব্যাংকিং ক্যাম্পেইন’ বাহুবল থেকে মাধবপুরের কাশিমনগর পুলিশ ফাঁড়িতে নতুন আইসি ইকতার মিয়া বাহুবলে ইনডোরে খেলার সময়সূচি নিয়ে তিন ঘণ্টা সংঘর্ষ, আহত অর্ধশত বাহুবলের হরাইটেকায় চায়ের বিল নিয়ে তর্কের জেরে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, আহত ১৫-২০ বাহুবলে ইয়াবা সেবন করে উশৃঙ্খল আচরণ, যুবকের ৬ মাসের কারাদণ্ড

মাদ্রাসায় শিশু শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন কার্যকর জবাবদিহি

মাদ্রাসা আমাদের সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা। ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা গ্রহণের জন্য অভিভাবকেরা আস্থা রেখে সন্তানদের মাদ্রাসায় পাঠান। বিশেষ করে আবাসিক মাদ্রাসার ক্ষেত্রে এই আস্থার জায়গাটি আরও গভীর। সন্তান পরিবারের কাছ থেকে দূরে থেকে দিনের পর দিন শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে থাকে। ফলে তার শিক্ষা, চরিত্র গঠন ও নিরাপত্তার দায়িত্বও প্রতিষ্ঠানের ওপর অনেক বেশি বর্তায়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের যৌ”ন নিপী-ড়ন ও বলা*ৎকা*রের অভিযোগ সামনে আসছে। প্রতিটি ঘটনার সত্যতা তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।

অভিযোগ উঠলেই কাউকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করা যায় না। একই সঙ্গে এসব অভিযোগকে একেবারে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে এড়িয়ে যাওয়ারও সুযোগ নেই। বরং এসব ঘটনা আমাদের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে, আইন আছে, তবু মাদ্রাসাশিক্ষার্থীরা কেন নিরাপদ নয়? এই প্রশ্ন মাদ্রাসাবিরোধী কোনো প্রশ্ন নয়। বরং মাদ্রাসার প্রতি দায়িত্ববোধ থেকেই এই প্রশ্ন তোলা দরকার।

★সাভারের ঘটনাটি যে প্রশ্ন সামনে এনেছে

সাম্প্রতিক সময়ে সাভারের একটি মাদ্রাসার ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পূর্ব শাহীবাগের মারকাযুল উলুম আশ-শরইয়্যাহ মাদ্রাসার সাত বছর বয়সী এক আবাসিক শিক্ষার্থীকে দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে ব-লাৎ*কার ও শারীরিক নি-র্যা-তনের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় চার শিক্ষক ও ছয় শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। মামলার এজাহার ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে ৬ জুলাই পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে শিশুটিকে নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে।

শিশুটির পরিবারের ভাষ্য, বাড়িতে এলে দীর্ঘদিন ধরে তাকে মনমরা দেখা যেত। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে শিশুটিকে মাদ্রাসা থেকে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। ১৪ আগস্ট পরিবারের কাছে সে নি-র্যা-তনের কথা জানায় বলে তার বাবা জানিয়েছেন। অসুস্থ হয়ে পড়ার পর তাকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, শিশুটির বাবার অভিযোগ, তিনি বিষয়টি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষকে জানানোর পর অভিযুক্তদের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও পরদিন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং বিষয়টি নিয়ে চুপ থাকতে বলা ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগও তিনি করেছেন। এসব অভিযোগ তদন্ত করে সত্যতা নির্ধারণ করতে হবে। তবে যদি অভিযোগগুলো সত্য হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরে এত বড় ঘটনা ঘটার পরও কেন দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হলো না? আদালতের নির্দেশে ২৬ আগস্ট মামলাটি নথিভুক্ত হওয়ার পরও প্রথম দিকে কোনো আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় আসে। পরে ৪ সেপ্টেম্বর একজন এবং ৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে আরও একজন আসামি গ্রেপ্তারের খবর এসেছে।

সাভারের এই ঘটনা তাই শুধু একটি নির্দিষ্ট মাদ্রাসার ঘটনা হিসেবে দেখলে হবে না। এটি আমাদের পুরো আবাসিক শিক্ষাব্যবস্থার নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে।

আইন কি নেই?

কোনো কোনো আলোচনায় বলা হয়, মাদ্রাসাশিক্ষার্থীদের বলা*ৎকা*রের বিরুদ্ধে দেশে কঠোর আইন নেই। বিষয়টি এখন আর এভাবে বলা ঠিক হবে না। বাংলাদেশের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এ ২০২৫ সালের সংশোধনের মাধ্যমে ‘বলা*ৎকা*র’-এর সংজ্ঞা যুক্ত করা হয়েছে। আইনে বলা হয়েছে, কোনো ছেলে শিশুর মুখ বা পায়ুপথে সংঘটিত যৌনকর্মকে বলাৎকার হিসেবে গণ্য করা হবে। একই সঙ্গে ধারা ৯-এর উদ্দেশ্যে ‘ধর্ষণ’-এর মধ্যে বলাৎকারকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ধারা ৯-(১) অনুযায়ী নারী বা শিশুকে ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড। আইনের সংজ্ঞা অনুযায়ী, এখানে শিশু বলতে অনধিক ১৬ বছর বয়সী ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ বলা*ৎকা*রের মতো অপরাধকে আইনের বাইরে রাখা হয়নি। বরং আইন এর জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রেখেছে।

আরও পড়ুনঃ  বাহুবলে অবৈধ বালু উত্তোলন ও পরিবহন, ২ লাখ টাকা জরিমানা

তাহলে প্রশ্ন হলো, আইন থাকার পরও কেন ঘটনা ঘটছে?
আমার মনে হয়, এই জায়গাতেই আমাদের মূল আলোচনা হওয়া উচিত। শুধু আইন আরও কঠোর করার কথা বললেই সমস্যার সমাধান হবে না। আইন প্রয়োগ কতটা হচ্ছে, অপরাধের অভিযোগ উঠলে প্রতিষ্ঠান কতটা দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছে, ভুক্তভোগী ও তার পরিবার অভিযোগ করতে গিয়ে কোনো চাপের মুখে পড়ছে কি না, এসব প্রশ্নও সামনে আনতে হবে।

আইন থাকলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না, একটি আইন তখনই কার্যকর হয়, যখন মানুষ জানে অপরাধ করলে তাকে আইনের মুখোমুখি হতে হবে এবং সেই আইন বাস্তবে প্রয়োগ হবে। মাদ্রাসার ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই। কোনো শিক্ষক বা দায়িত্বশীল ব্যক্তি যদি মনে করেন, শিক্ষার্থীর সঙ্গে অপরাধ করলেও বিষয়টি প্রতিষ্ঠান বা স্থানীয়ভাবে মীমাংসা করে ফেলা যাবে, তাহলে আইন যত কঠোরই হোক, তার প্রতিরোধমূলক প্রভাব কমে যাবে।

কোনো শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে যৌ*ন নি*পী-ড়নের অভিযোগ উঠলে প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া, শিশুটিকে নিরাপদে রাখা এবং আইনগত প্রক্রিয়ায় যাওয়া। অভিযোগ সত্য না মিথ্যা, সেটি তদন্ত ও আদালতের বিষয়। কিন্তু অভিযোগ গোপন করা বা চাপ দিয়ে মীমাংসা করার চেষ্টা কোনোভাবেই সমাধান হতে পারে না।

★সালিশে এমন অভিযোগের সমাধান নয়

সম্প্রতি কুষ্টিয়ার কুমারখালী ও কুমিল্লার চান্দিনার ঘটনায় স্থানীয় সালিশের প্রসঙ্গ সংবাদে এসেছে। কুমারখালীতে ২১ জুলাই এক মাদ্রাসাশিক্ষকের বিরুদ্ধে ১০ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীকে বলাৎকারের অভিযোগ ওঠে। পরে শিক্ষককে আটক করা হয়। কুমিল্লার চান্দিনায় ১৮ আগস্ট এক মাদ্রাসাশিক্ষকের বিরুদ্ধে এক শিক্ষার্থীকে বলাৎকারের অভিযোগ ওঠার পর স্থানীয় সালিশ চলাকালে তাকে আটক করা হয়। এসব ঘটনায় অভিযোগের সত্যতা সংশ্লিষ্ট তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে। কিন্তু একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার, যৌ-ন নি/পী*ড়নের অভিযোগকে সাধারণ সামাজিক বিরোধের মতো বিবেচনা করে স্থানীয় সালিশে মীমাংসা করার সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। কারণ এখানে শুধু দুই পক্ষের বিরোধ নেই। এখানে একজন শিক্ষার্থী, তার নিরাপত্তা, তার ভবিষ্যৎ এবং একটি গুরুতর অপরাধের অভিযোগ জড়িত।

কোনো প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষার জন্য অভিযোগ চাপা দেওয়া হলে সেই সুনাম আসলে রক্ষা হয় না। বরং ভবিষ্যতে অপরাধের পথ আরও সহজ হয়ে যায়।

★শিক্ষার্থী অভিযোগ করবে কোথায়?

আবাসিক মাদ্রাসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো, একজন শিক্ষার্থী বিপদে পড়লে সে কার কাছে যাবে? একজন শিশু বা কিশোর দিনের অধিকাংশ সময় মাদ্রাসায় কাটায়। শিক্ষক, হুজুর, বড় ভাই বা দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাই তার চারপাশের মানুষ। সেই পরিবেশের কারও বিরুদ্ধে যদি অভিযোগ ওঠে, তখন তার নিরাপদে অভিযোগ জানানোর সুযোগ থাকতে হবে।

আরও পড়ুনঃ  ঐতিহ্যবাহী বাহুবলের গৌরব রক্ষা ও সামাজিক সম্প্রীতি বিনির্মাণে আমাদের যৌথ দায়বদ্ধতা

প্রতিটি আবাসিক মাদ্রাসায় একটি নির্দিষ্ট অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা থাকা দরকার। এমন দায়িত্বশীল ব্যক্তি বা কমিটি থাকতে পারে, যার কাছে শিক্ষার্থী নির্ভয়ে নিজের কথা বলতে পারবে। অভিযোগ জানানোর পর তাকে অপমান, ভয়ভীতি বা প্রতিশোধের আশঙ্কায় পড়তে হবে না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। অভিভাবকদের সঙ্গেও প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত যোগাযোগ থাকা প্রয়োজন। সন্তান হঠাৎ অস্বাভাবিক আচরণ করলে, মাদ্রাসায় যেতে না চাইলে, অতিরিক্ত ভীত হয়ে পড়লে বা আচরণে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
অবশ্য কোনো আচরণগত পরিবর্তনকে একা অপরাধের প্রমাণ হিসেবে দেখা যাবে না। কিন্তু এসব পরিবর্তনকে উপেক্ষা করাও ঠিক নয়।

★শিক্ষক মানেই সন্দেহ নয়, তবু তদারকি দরকার
এখানে আরেকটি ভারসাম্যের কথা মনে রাখা জরুরি। কয়েকটি ঘটনার কারণে সব মাদ্রাসার শিক্ষককে সন্দেহের চোখে দেখা যাবে না। অসংখ্য শিক্ষক আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পড়াচ্ছেন। তাঁদের সম্মান ও নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ভালো শিক্ষক আছেন, তাই তদারকির প্রয়োজন নেই, এমন ধারণাও ঠিক নয়। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতার পাশাপাশি ব্যক্তির আচরণ ও অতীত সম্পর্কে যথাসম্ভব যাচাই থাকা প্রয়োজন। আবাসিক প্রতিষ্ঠানে কোন শিক্ষক কোন দায়িত্বে থাকবেন, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একান্ত অবস্থানের সুযোগ কতটা থাকবে, রাতে শিক্ষার্থীদের তদারকি কীভাবে হবে, এসব বিষয়েও সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা দরকার।

তদারকি মানে সবাইকে অবিশ্বাস করা নয়। বরং এটি শিক্ষার্থী এবং দায়িত্বশীল শিক্ষক উভয়ের নিরাপত্তার জন্যই প্রয়োজন।

★প্রতিষ্ঠান কি শুধু শিক্ষক নিয়োগ দিয়েই দায়মুক্ত?
একটি মাদ্রাসায় অপরাধ ঘটলে স্বাভাবিকভাবেই প্রথম প্রশ্ন আসে, অপরাধী কে? এটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কিন্তু তার পাশাপাশি আরও কিছু প্রশ্ন করা দরকার। প্রতিষ্ঠান কি কোনো অভিযোগ পেয়েছিল? পেলে কী ব্যবস্থা নিয়েছিল? শিক্ষার্থী আগে কাউকে কিছু জানিয়েছিল কি না? অভিভাবক অভিযোগ করার পর কর্তৃপক্ষ কী করেছে? অভিযোগের পর অভিযুক্ত ব্যক্তিকে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সরিয়ে রাখা হয়েছিল কি না? এসব প্রশ্নের উত্তরও গুরুত্বপূর্ণ।

কোনো প্রতিষ্ঠানে অপরাধ সংঘটিত হলে প্রত্যেক কর্মকর্তা বা শিক্ষককে অপরাধী বানানো যাবে না। আবার প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনার দায়ও পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। বিশেষ করে অভিযোগ পাওয়ার পর কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে বিষয়টি গোপন করেন বা আইনগত ব্যবস্থা নিতে বাধা দেন, তাহলে তার দায়ও নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

★আইন প্রয়োগের পাশাপাশি প্রতিরোধ

আমরা সাধারণত ঘটনা ঘটার পর শাস্তির কথা বলি। কিন্তু শিশুদের নিরাপত্তার জন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাও জরুরি।
মাদ্রাসাগুলোতে শিশু সুরক্ষা বিষয়ে শিক্ষক ও দায়িত্বশীলদের প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। শিক্ষার্থীদেরও বয়স উপযোগীভাবে শেখানো দরকার, কোন আচরণ অনুচিত, বিপদে পড়লে কাকে জানাতে হবে এবং কোনো ব্যক্তি ভয় দেখালেও কীভাবে সাহায্য চাইতে হবে। অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে। সন্তানকে মাদ্রাসায় দিয়ে শুধু দায়িত্ব শেষ হয়ে গেছে, এমন ভাবার সুযোগ নেই। নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে হবে, সন্তানের কথা শুনতে হবে এবং তার কোনো অভিযোগ থাকলে গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে আবাসিক শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান ও অভিভাবকের মধ্যে যোগাযোগের একটি কার্যকর ব্যবস্থা থাকা অত্যন্ত জরুরি।

আরও পড়ুনঃ  ঐতিহ্যবাহী বাহুবলের গৌরব রক্ষা ও সামাজিক সম্প্রীতি বিনির্মাণে আমাদের যৌথ দায়বদ্ধতা

★মাদ্রাসার সুনাম রক্ষার পথ কোনটি?

মাদ্রাসার বিরুদ্ধে কোনো একটি ঘটনার দায় চাপিয়ে পুরো মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা যেমন অন্যায়, তেমনি মাদ্রাসার সুনামের কথা বলে কোনো অপরাধের অভিযোগ আড়াল করাও অন্যায়। আমার মনে হয়, মাদ্রাসার সুনাম রক্ষার সবচেয়ে ভালো পথ হলো অপরাধের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা দেখানো। কোনো শিক্ষক অপরাধ করলে তার বিচার হতে হবে। কোনো শিক্ষার্থী অপরাধে জড়িত হলে বয়স ও আইনের বিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা হতে হবে। আবার কোনো অভিযোগ মিথ্যা হলে তদন্তের মাধ্যমে সেটিও পরিষ্কার হতে হবে।

অভিযুক্ত ব্যক্তি শিক্ষক, পরিচালক কিংবা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যতই ঘনিষ্ঠ হোন, তার পরিচয় তাকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখতে পারে না। নতুন আইন নয়, কোথায় ঘাটতি তা চিহ্নিত করা জরুরি, আমরা যদি সত্যিই মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাই, তাহলে আলোচনাটি শুধু নতুন আইন করার দাবিতে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। বর্তমান আইনে বলা*ৎকারকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এবং ধারা ৯-এর ক্ষেত্রে ধর্ষণের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শাস্তির বিধানও কঠোর। তাই কোথাও আইনের বাস্তব প্রয়োগে ঘাটতি থাকলে সেটি চিহ্নিত করতে হবে। কোনো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে আইনি অস্পষ্টতা থাকলে তা সংশোধনের উদ্যোগ নিতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে আইন প্রয়োগের দুর্বলতা, অভিযোগ গোপন করার প্রবণতা, সামাজিক চাপ এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক জবাবদিহির অভাব নিয়েও কথা বলতে হবে।

আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একটি শিশু যেন অপরাধের শিকার হওয়ার পরও একা হয়ে না যায়।
সে যেন জানে, তার কথা শোনার মানুষ আছে। তার পরিবার তার পাশে আছে। প্রতিষ্ঠান তার নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেবে। আর অপরাধের অভিযোগ উঠলে আইন তার নিজস্ব গতিতে কাজ করবে।

★শেষ কথা
সাভারের সাত বছর বয়সী শিশুটির ঘটনা আমাদের আবারও সেই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে, আইন আছে, তবু মাদ্রাসাশিক্ষার্থীরা কেন নিরাপদ নয়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে মাদ্রাসাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো নয়, বরং মাদ্রাসার ভেতরের দুর্বল জায়গাগুলো চিহ্নিত করা দরকার। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক আস্থার। সেই আস্থার অপব্যবহার হলে তা শুধু একজন শিক্ষার্থীর ক্ষতি করে না, পুরো শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি মানুষের বিশ্বাসকে আঘাত করে।
তাই এখন প্রয়োজন স্পষ্ট অবস্থান। অপরাধী যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। অভিযোগকারী শিক্ষার্থীকে নিরাপত্তা দিতে হবে। কোনো অভিযোগ সামাজিক চাপ বা প্রতিষ্ঠানের সুনামের অজুহাতে চাপা দেওয়া যাবে না। একই সঙ্গে অভিযুক্তের অধিকারও রক্ষা করতে হবে এবং তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় সত্য নির্ধারিত হতে দিতে হবে।

মাদ্রাসার সুনাম বাঁচানোর জন্য অপরাধ লুকানো নয়, অপরাধের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
কারণ একটি মাদ্রাসার সবচেয়ে বড় পরিচয় তার ভবন নয়, তার পাঠ্যক্রমও নয়। তার সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো সেখানে পড়তে আসা একটি শিশু কতটা নিরাপদ।

লেখক-মুফতী নিজাম উদ্দিন আল আদনান
সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি, ছাত্র জমিয়ত বাংলাদেশ
চেয়ারম্যান, বাহুবল-নবীগঞ্জ উন্নয়ন ফাউন্ডেশন

Tag :
জনপ্রিয় পোস্ট

ঐতিহ্যবাহী বাহুবলের গৌরব রক্ষা ও সামাজিক সম্প্রীতি বিনির্মাণে আমাদের যৌথ দায়বদ্ধতা

মাদ্রাসায় শিশু শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন কার্যকর জবাবদিহি

আপডেটের সময়: ০৪:৩৮:২৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মাদ্রাসা আমাদের সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা। ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা গ্রহণের জন্য অভিভাবকেরা আস্থা রেখে সন্তানদের মাদ্রাসায় পাঠান। বিশেষ করে আবাসিক মাদ্রাসার ক্ষেত্রে এই আস্থার জায়গাটি আরও গভীর। সন্তান পরিবারের কাছ থেকে দূরে থেকে দিনের পর দিন শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে থাকে। ফলে তার শিক্ষা, চরিত্র গঠন ও নিরাপত্তার দায়িত্বও প্রতিষ্ঠানের ওপর অনেক বেশি বর্তায়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের যৌ”ন নিপী-ড়ন ও বলা*ৎকা*রের অভিযোগ সামনে আসছে। প্রতিটি ঘটনার সত্যতা তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।

অভিযোগ উঠলেই কাউকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করা যায় না। একই সঙ্গে এসব অভিযোগকে একেবারে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে এড়িয়ে যাওয়ারও সুযোগ নেই। বরং এসব ঘটনা আমাদের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে, আইন আছে, তবু মাদ্রাসাশিক্ষার্থীরা কেন নিরাপদ নয়? এই প্রশ্ন মাদ্রাসাবিরোধী কোনো প্রশ্ন নয়। বরং মাদ্রাসার প্রতি দায়িত্ববোধ থেকেই এই প্রশ্ন তোলা দরকার।

★সাভারের ঘটনাটি যে প্রশ্ন সামনে এনেছে

সাম্প্রতিক সময়ে সাভারের একটি মাদ্রাসার ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পূর্ব শাহীবাগের মারকাযুল উলুম আশ-শরইয়্যাহ মাদ্রাসার সাত বছর বয়সী এক আবাসিক শিক্ষার্থীকে দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে ব-লাৎ*কার ও শারীরিক নি-র্যা-তনের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় চার শিক্ষক ও ছয় শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। মামলার এজাহার ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে ৬ জুলাই পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে শিশুটিকে নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে।

শিশুটির পরিবারের ভাষ্য, বাড়িতে এলে দীর্ঘদিন ধরে তাকে মনমরা দেখা যেত। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে শিশুটিকে মাদ্রাসা থেকে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। ১৪ আগস্ট পরিবারের কাছে সে নি-র্যা-তনের কথা জানায় বলে তার বাবা জানিয়েছেন। অসুস্থ হয়ে পড়ার পর তাকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, শিশুটির বাবার অভিযোগ, তিনি বিষয়টি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষকে জানানোর পর অভিযুক্তদের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও পরদিন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং বিষয়টি নিয়ে চুপ থাকতে বলা ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগও তিনি করেছেন। এসব অভিযোগ তদন্ত করে সত্যতা নির্ধারণ করতে হবে। তবে যদি অভিযোগগুলো সত্য হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরে এত বড় ঘটনা ঘটার পরও কেন দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হলো না? আদালতের নির্দেশে ২৬ আগস্ট মামলাটি নথিভুক্ত হওয়ার পরও প্রথম দিকে কোনো আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় আসে। পরে ৪ সেপ্টেম্বর একজন এবং ৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে আরও একজন আসামি গ্রেপ্তারের খবর এসেছে।

সাভারের এই ঘটনা তাই শুধু একটি নির্দিষ্ট মাদ্রাসার ঘটনা হিসেবে দেখলে হবে না। এটি আমাদের পুরো আবাসিক শিক্ষাব্যবস্থার নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে।

আইন কি নেই?

কোনো কোনো আলোচনায় বলা হয়, মাদ্রাসাশিক্ষার্থীদের বলা*ৎকা*রের বিরুদ্ধে দেশে কঠোর আইন নেই। বিষয়টি এখন আর এভাবে বলা ঠিক হবে না। বাংলাদেশের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এ ২০২৫ সালের সংশোধনের মাধ্যমে ‘বলা*ৎকা*র’-এর সংজ্ঞা যুক্ত করা হয়েছে। আইনে বলা হয়েছে, কোনো ছেলে শিশুর মুখ বা পায়ুপথে সংঘটিত যৌনকর্মকে বলাৎকার হিসেবে গণ্য করা হবে। একই সঙ্গে ধারা ৯-এর উদ্দেশ্যে ‘ধর্ষণ’-এর মধ্যে বলাৎকারকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ধারা ৯-(১) অনুযায়ী নারী বা শিশুকে ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড। আইনের সংজ্ঞা অনুযায়ী, এখানে শিশু বলতে অনধিক ১৬ বছর বয়সী ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ বলা*ৎকা*রের মতো অপরাধকে আইনের বাইরে রাখা হয়নি। বরং আইন এর জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রেখেছে।

আরও পড়ুনঃ  বাহুবলে অবৈধ বালু উত্তোলন ও পরিবহন, ২ লাখ টাকা জরিমানা

তাহলে প্রশ্ন হলো, আইন থাকার পরও কেন ঘটনা ঘটছে?
আমার মনে হয়, এই জায়গাতেই আমাদের মূল আলোচনা হওয়া উচিত। শুধু আইন আরও কঠোর করার কথা বললেই সমস্যার সমাধান হবে না। আইন প্রয়োগ কতটা হচ্ছে, অপরাধের অভিযোগ উঠলে প্রতিষ্ঠান কতটা দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছে, ভুক্তভোগী ও তার পরিবার অভিযোগ করতে গিয়ে কোনো চাপের মুখে পড়ছে কি না, এসব প্রশ্নও সামনে আনতে হবে।

আইন থাকলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না, একটি আইন তখনই কার্যকর হয়, যখন মানুষ জানে অপরাধ করলে তাকে আইনের মুখোমুখি হতে হবে এবং সেই আইন বাস্তবে প্রয়োগ হবে। মাদ্রাসার ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই। কোনো শিক্ষক বা দায়িত্বশীল ব্যক্তি যদি মনে করেন, শিক্ষার্থীর সঙ্গে অপরাধ করলেও বিষয়টি প্রতিষ্ঠান বা স্থানীয়ভাবে মীমাংসা করে ফেলা যাবে, তাহলে আইন যত কঠোরই হোক, তার প্রতিরোধমূলক প্রভাব কমে যাবে।

কোনো শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে যৌ*ন নি*পী-ড়নের অভিযোগ উঠলে প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া, শিশুটিকে নিরাপদে রাখা এবং আইনগত প্রক্রিয়ায় যাওয়া। অভিযোগ সত্য না মিথ্যা, সেটি তদন্ত ও আদালতের বিষয়। কিন্তু অভিযোগ গোপন করা বা চাপ দিয়ে মীমাংসা করার চেষ্টা কোনোভাবেই সমাধান হতে পারে না।

★সালিশে এমন অভিযোগের সমাধান নয়

সম্প্রতি কুষ্টিয়ার কুমারখালী ও কুমিল্লার চান্দিনার ঘটনায় স্থানীয় সালিশের প্রসঙ্গ সংবাদে এসেছে। কুমারখালীতে ২১ জুলাই এক মাদ্রাসাশিক্ষকের বিরুদ্ধে ১০ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীকে বলাৎকারের অভিযোগ ওঠে। পরে শিক্ষককে আটক করা হয়। কুমিল্লার চান্দিনায় ১৮ আগস্ট এক মাদ্রাসাশিক্ষকের বিরুদ্ধে এক শিক্ষার্থীকে বলাৎকারের অভিযোগ ওঠার পর স্থানীয় সালিশ চলাকালে তাকে আটক করা হয়। এসব ঘটনায় অভিযোগের সত্যতা সংশ্লিষ্ট তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে। কিন্তু একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার, যৌ-ন নি/পী*ড়নের অভিযোগকে সাধারণ সামাজিক বিরোধের মতো বিবেচনা করে স্থানীয় সালিশে মীমাংসা করার সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। কারণ এখানে শুধু দুই পক্ষের বিরোধ নেই। এখানে একজন শিক্ষার্থী, তার নিরাপত্তা, তার ভবিষ্যৎ এবং একটি গুরুতর অপরাধের অভিযোগ জড়িত।

কোনো প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষার জন্য অভিযোগ চাপা দেওয়া হলে সেই সুনাম আসলে রক্ষা হয় না। বরং ভবিষ্যতে অপরাধের পথ আরও সহজ হয়ে যায়।

★শিক্ষার্থী অভিযোগ করবে কোথায়?

আবাসিক মাদ্রাসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো, একজন শিক্ষার্থী বিপদে পড়লে সে কার কাছে যাবে? একজন শিশু বা কিশোর দিনের অধিকাংশ সময় মাদ্রাসায় কাটায়। শিক্ষক, হুজুর, বড় ভাই বা দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাই তার চারপাশের মানুষ। সেই পরিবেশের কারও বিরুদ্ধে যদি অভিযোগ ওঠে, তখন তার নিরাপদে অভিযোগ জানানোর সুযোগ থাকতে হবে।

আরও পড়ুনঃ  ঐতিহ্যবাহী বাহুবলের গৌরব রক্ষা ও সামাজিক সম্প্রীতি বিনির্মাণে আমাদের যৌথ দায়বদ্ধতা

প্রতিটি আবাসিক মাদ্রাসায় একটি নির্দিষ্ট অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা থাকা দরকার। এমন দায়িত্বশীল ব্যক্তি বা কমিটি থাকতে পারে, যার কাছে শিক্ষার্থী নির্ভয়ে নিজের কথা বলতে পারবে। অভিযোগ জানানোর পর তাকে অপমান, ভয়ভীতি বা প্রতিশোধের আশঙ্কায় পড়তে হবে না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। অভিভাবকদের সঙ্গেও প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত যোগাযোগ থাকা প্রয়োজন। সন্তান হঠাৎ অস্বাভাবিক আচরণ করলে, মাদ্রাসায় যেতে না চাইলে, অতিরিক্ত ভীত হয়ে পড়লে বা আচরণে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
অবশ্য কোনো আচরণগত পরিবর্তনকে একা অপরাধের প্রমাণ হিসেবে দেখা যাবে না। কিন্তু এসব পরিবর্তনকে উপেক্ষা করাও ঠিক নয়।

★শিক্ষক মানেই সন্দেহ নয়, তবু তদারকি দরকার
এখানে আরেকটি ভারসাম্যের কথা মনে রাখা জরুরি। কয়েকটি ঘটনার কারণে সব মাদ্রাসার শিক্ষককে সন্দেহের চোখে দেখা যাবে না। অসংখ্য শিক্ষক আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পড়াচ্ছেন। তাঁদের সম্মান ও নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ভালো শিক্ষক আছেন, তাই তদারকির প্রয়োজন নেই, এমন ধারণাও ঠিক নয়। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতার পাশাপাশি ব্যক্তির আচরণ ও অতীত সম্পর্কে যথাসম্ভব যাচাই থাকা প্রয়োজন। আবাসিক প্রতিষ্ঠানে কোন শিক্ষক কোন দায়িত্বে থাকবেন, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একান্ত অবস্থানের সুযোগ কতটা থাকবে, রাতে শিক্ষার্থীদের তদারকি কীভাবে হবে, এসব বিষয়েও সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা দরকার।

তদারকি মানে সবাইকে অবিশ্বাস করা নয়। বরং এটি শিক্ষার্থী এবং দায়িত্বশীল শিক্ষক উভয়ের নিরাপত্তার জন্যই প্রয়োজন।

★প্রতিষ্ঠান কি শুধু শিক্ষক নিয়োগ দিয়েই দায়মুক্ত?
একটি মাদ্রাসায় অপরাধ ঘটলে স্বাভাবিকভাবেই প্রথম প্রশ্ন আসে, অপরাধী কে? এটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কিন্তু তার পাশাপাশি আরও কিছু প্রশ্ন করা দরকার। প্রতিষ্ঠান কি কোনো অভিযোগ পেয়েছিল? পেলে কী ব্যবস্থা নিয়েছিল? শিক্ষার্থী আগে কাউকে কিছু জানিয়েছিল কি না? অভিভাবক অভিযোগ করার পর কর্তৃপক্ষ কী করেছে? অভিযোগের পর অভিযুক্ত ব্যক্তিকে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সরিয়ে রাখা হয়েছিল কি না? এসব প্রশ্নের উত্তরও গুরুত্বপূর্ণ।

কোনো প্রতিষ্ঠানে অপরাধ সংঘটিত হলে প্রত্যেক কর্মকর্তা বা শিক্ষককে অপরাধী বানানো যাবে না। আবার প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনার দায়ও পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। বিশেষ করে অভিযোগ পাওয়ার পর কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে বিষয়টি গোপন করেন বা আইনগত ব্যবস্থা নিতে বাধা দেন, তাহলে তার দায়ও নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

★আইন প্রয়োগের পাশাপাশি প্রতিরোধ

আমরা সাধারণত ঘটনা ঘটার পর শাস্তির কথা বলি। কিন্তু শিশুদের নিরাপত্তার জন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাও জরুরি।
মাদ্রাসাগুলোতে শিশু সুরক্ষা বিষয়ে শিক্ষক ও দায়িত্বশীলদের প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। শিক্ষার্থীদেরও বয়স উপযোগীভাবে শেখানো দরকার, কোন আচরণ অনুচিত, বিপদে পড়লে কাকে জানাতে হবে এবং কোনো ব্যক্তি ভয় দেখালেও কীভাবে সাহায্য চাইতে হবে। অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে। সন্তানকে মাদ্রাসায় দিয়ে শুধু দায়িত্ব শেষ হয়ে গেছে, এমন ভাবার সুযোগ নেই। নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে হবে, সন্তানের কথা শুনতে হবে এবং তার কোনো অভিযোগ থাকলে গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে আবাসিক শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান ও অভিভাবকের মধ্যে যোগাযোগের একটি কার্যকর ব্যবস্থা থাকা অত্যন্ত জরুরি।

আরও পড়ুনঃ  বাহুবলে অবৈধ বালু উত্তোলন ও পরিবহন, ২ লাখ টাকা জরিমানা

★মাদ্রাসার সুনাম রক্ষার পথ কোনটি?

মাদ্রাসার বিরুদ্ধে কোনো একটি ঘটনার দায় চাপিয়ে পুরো মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা যেমন অন্যায়, তেমনি মাদ্রাসার সুনামের কথা বলে কোনো অপরাধের অভিযোগ আড়াল করাও অন্যায়। আমার মনে হয়, মাদ্রাসার সুনাম রক্ষার সবচেয়ে ভালো পথ হলো অপরাধের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা দেখানো। কোনো শিক্ষক অপরাধ করলে তার বিচার হতে হবে। কোনো শিক্ষার্থী অপরাধে জড়িত হলে বয়স ও আইনের বিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা হতে হবে। আবার কোনো অভিযোগ মিথ্যা হলে তদন্তের মাধ্যমে সেটিও পরিষ্কার হতে হবে।

অভিযুক্ত ব্যক্তি শিক্ষক, পরিচালক কিংবা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যতই ঘনিষ্ঠ হোন, তার পরিচয় তাকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখতে পারে না। নতুন আইন নয়, কোথায় ঘাটতি তা চিহ্নিত করা জরুরি, আমরা যদি সত্যিই মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাই, তাহলে আলোচনাটি শুধু নতুন আইন করার দাবিতে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। বর্তমান আইনে বলা*ৎকারকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এবং ধারা ৯-এর ক্ষেত্রে ধর্ষণের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শাস্তির বিধানও কঠোর। তাই কোথাও আইনের বাস্তব প্রয়োগে ঘাটতি থাকলে সেটি চিহ্নিত করতে হবে। কোনো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে আইনি অস্পষ্টতা থাকলে তা সংশোধনের উদ্যোগ নিতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে আইন প্রয়োগের দুর্বলতা, অভিযোগ গোপন করার প্রবণতা, সামাজিক চাপ এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক জবাবদিহির অভাব নিয়েও কথা বলতে হবে।

আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একটি শিশু যেন অপরাধের শিকার হওয়ার পরও একা হয়ে না যায়।
সে যেন জানে, তার কথা শোনার মানুষ আছে। তার পরিবার তার পাশে আছে। প্রতিষ্ঠান তার নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেবে। আর অপরাধের অভিযোগ উঠলে আইন তার নিজস্ব গতিতে কাজ করবে।

★শেষ কথা
সাভারের সাত বছর বয়সী শিশুটির ঘটনা আমাদের আবারও সেই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে, আইন আছে, তবু মাদ্রাসাশিক্ষার্থীরা কেন নিরাপদ নয়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে মাদ্রাসাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো নয়, বরং মাদ্রাসার ভেতরের দুর্বল জায়গাগুলো চিহ্নিত করা দরকার। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক আস্থার। সেই আস্থার অপব্যবহার হলে তা শুধু একজন শিক্ষার্থীর ক্ষতি করে না, পুরো শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি মানুষের বিশ্বাসকে আঘাত করে।
তাই এখন প্রয়োজন স্পষ্ট অবস্থান। অপরাধী যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। অভিযোগকারী শিক্ষার্থীকে নিরাপত্তা দিতে হবে। কোনো অভিযোগ সামাজিক চাপ বা প্রতিষ্ঠানের সুনামের অজুহাতে চাপা দেওয়া যাবে না। একই সঙ্গে অভিযুক্তের অধিকারও রক্ষা করতে হবে এবং তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় সত্য নির্ধারিত হতে দিতে হবে।

মাদ্রাসার সুনাম বাঁচানোর জন্য অপরাধ লুকানো নয়, অপরাধের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
কারণ একটি মাদ্রাসার সবচেয়ে বড় পরিচয় তার ভবন নয়, তার পাঠ্যক্রমও নয়। তার সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো সেখানে পড়তে আসা একটি শিশু কতটা নিরাপদ।

লেখক-মুফতী নিজাম উদ্দিন আল আদনান
সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি, ছাত্র জমিয়ত বাংলাদেশ
চেয়ারম্যান, বাহুবল-নবীগঞ্জ উন্নয়ন ফাউন্ডেশন